Skip to main content

পুরোনো পৃথিবী থেকে।

 



প্রিয়,

​শীত আজ আমাকে কোণঠাসা করে দিয়েছে... ভিড় থেকে অনেক দূরে, অন্ধকার রাস্তায় পাথরগুলো গুনতে গুনতে আজ তোমাকে লিখছি। মনে আছে আমাদের কথা? আমরা সেই সন্ধিক্ষণের সন্তান, সেই '৮৮-র প্রজন্ম, যারা ধুলোমাখা শৈশব আর মনের গহীনে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নিয়ে বড় হয়েছি।

​আমি সেই স্পর্শ টা মিস করি। খুব মিস করি সেই কঠিন সময়টাকে, যখন তোমাকে ভালোবাসা এত সহজ সুলভ ছিল না।

​মনে পড়ে সেই নোকিয়া ফোনের শক্ত রাবারের কি-প্যাড? একটা 'C' লেখার জন্য তিনবার বোতাম টিপতে হতো, শুধু তোমাকে এটুকু বোঝাতে যে আমি তোমার কথা ভাবছি। তখন তো আর 'অটোকারেক্ট' ছিল না যে আমার ব্যাকুলতাকে মসৃণ করে দেবে, ছিল না কোনো 'প্রেডিক্টিভ টেক্সট' যা বলার আগেই আমার মনের কথা বুঝে যাবে। প্রতিটি শব্দের পেছনে একটা যত্ন ছিল, একটা সময় খরচ হতো। প্রতিটি মেসেজে লেগে থাকত আঙুলের স্পর্শ।

​তখন হাতে কোনো ম্যাপ ছিল না, মাথার ওপর ছিল না কোনো স্যাটেলাইট। সম্বল শুধু আমরা একে অন্যকে। আমরা তো হারিয়ে যেতাম—শহরের অলিগলিতে, খোলা মাঠে, আড্ডায়, তর্কে। হারিয়ে যাওয়াটাই ছিল আমাদের বিলাসিতা। তখন আমরা একে অপরের চোখের দিকে তাকাতাম, কোনো স্ক্রিনের দিকে নয়।

​আর ওই অপেক্ষা... ওই তীব্র আকাঙ্ক্ষা। তোমায় দেখতে পাবার।

আজকের এই ঝকঝকে, প্রলোভনে ভরা যান্ত্রিক পৃথিবীটা যেন শয়তানের মায়াজাল—আমাদের থেকে কেড়ে নিয়েছে অপেক্ষার মাধুর্য। আজ ভিডিও কলে হয়তো মুহূর্তেই সাত সমুদ্র পার হওয়া যায়, কিন্তু মনের মাঝে ওরা দেওয়াল তুলে দিয়েছে। আজ কত 'অপশন', কত 'সোয়াইপ রাইট '। কিন্তু আমাদের... আমাদের ছিল শুধু ওই 'টান'। আমাদের কোনো অপশনের দরকার ছিল না, কারণ আমরা পালাবার পথ খুঁজিনি। আমরা চেয়েছিলাম ওই টান, যা দূরে সরে গেলে আরও শক্ত হতো, ছিঁড়ে যেত না।

​আমার বড় ভয় হয় পরের প্রজন্মকে নিয়ে। ওরা বড্ড নিখুঁত, যেন রক্তমাংসের এক একটা এআই (AI)। ওরা দ্রুত, ওরা বুদ্ধিমান। কিন্তু ওরা কি কাঁদতে জানবে? ওরা কি জানবে যে প্রেম কোনো অংক মেলানো নয়, বরং অন্ধকারে দুমড়ে মুচড়ে একাকার হয়ে যাওয়া?

আমি চাই ওই হাড়হিম করা বাতাস। আমি চাই শীতে আঙুলের ডগাও অবশ হয়ে যাক। আমি চাই ওই লড়াইটা। কারণ ওই জমে যাওয়া কাঁচ ভাঙা শীতেই আমি আমার উষ্ণতা খুঁজে পাই, তোমাকে ভালোবাসার সাহস পাই।

​চোখ বন্ধ করে কখনো সেই ক্লাসরুমে ফিরে যেও। আমাকে খুঁজে নিও সেখানে, যেখানে জিপিএস কাজ করে না।

​ইতি,

সেই পুরোনো পৃথিবী থেকে।

Comments

Popular posts from this blog

বাষ্প

ঐযে আকাশ মেঘ, ওকে আমি বলেছি আমার মনের কথা কিছু টা শুনে একপশলা কেঁদে চলে গেছে। এখন আকাশে ঝলমলে রোদ সোঁদা মাটির গন্ধে মিলচ্ছে কথা গুলো বাষ্প হয়ে।। -ঋতজ্যোতি রায় 

​মৃত্যুর মুখোমুখি | Standing Before Death

 ​১৯৩১ সালের ২৩শে মার্চ। লাহোর সেন্ট্রাল জেল। ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত, হাতে সময় মাত্র কয়েক মিনিট। অথচ কক্ষের ভেতরে এক তরুণ বিপ্লবী নিমগ্ন হয়ে পড়ছেন একটি বই। কারারক্ষী যখন ডাকতে এলেন, সেই তরুণ নির্ভীক চিত্তে উত্তর দিয়েছিলেন— "দাঁড়ান, একজন বিপ্লবী আর একজন বিপ্লবীর সাথে কথা বলছে।" সেই তরুণ ছিলেন শহীদ-ই-আজম ভগত সিং, আর তাঁর হাতের সেই শেষ সঙ্গীটি ছিল ভ্লাদিমির লেনিনের একটি জীবনী। মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত যে আদর্শ একজন মানুষকে সাহস জোগাতে পারে, সেই নামই হলো লেনিন। ​লেনিন কেবল একটি নাম নয়, লেনিন হলো শোষিত মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর শব্দ। তিনি শিখিয়েছেন যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা কেবল ধনীদের পাহারাদার হতে পারে না; সাধারণ শ্রমিক, কৃষক আর মেহনতি মানুষেরও অধিকার আছে রাষ্ট্র পরিচালনার। তাঁর রাজনীতি কোনো ড্রয়িংরুমের চর্চা নয়, বরং তা হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা শ্রমজীবী মানুষের এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। আজ যখন কোনো গরিব মানুষ তার হকের লড়াই লড়ে, সেই লড়াইয়ের অনুপ্রেরণায় মিশে থাকেন লেনিন। ​কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, বাংলার মাটিতে আজ কিছু অশিক্ষিত ও সংস্কৃতিহীন উন্মত্ত গোষ্ঠী তাদের পেশীশক্তি জাহির কর...