Skip to main content

হেকেটির ভানু

 


তুমি আজ আলোকরেখায় ভাস্বর, রবি। 

তোমার সেই 'ভানু' নাম আজ সার্থক—তুমি মধ্যগগনের সূর্য। কিন্তু জানো তো, সূর্যের প্রখরতার পাশে ছায়ার কোনো স্থান থাকে না। আমি তো তোমার সেই দীর্ঘ ছায়াটুকু হয়েই থাকতে চেয়েছিলাম।

জোড়াসাঁকোর এই অতিকায় অন্দরমহলে যখন তুমি প্রথম এসেছিলে, তখন তুমি ছিলে একলা এক বালক, আর আমি ছিলেম একলা এক বালিকা। আমাদের সেই একাকিত্বের সন্ধিতে যে মৈত্রী জন্মেছিল, তাকে কি কেবল 'বৌঠান' আর 'ঠাকুরপো'-র সম্পর্কে বাঁধা যায়? ছাদের কার্নিশে বসে সেই যে মেঘমল্লারের সুর ভাঁজা, কিংবা তোমার সদ্যোজাত কবিতাগুলোর ব্যবচ্ছেদ করা—সেদিন কি ঘুণাক্ষরেও বুঝেছিলেম যে একদিন তোমার প্রতিটি পংক্তি আমারই বুকের পাঁজর দিয়ে খোদাই করতে হবে?

আমার অন্ধকার আকাশে তুমিই ছিলে একমাত্র ধ্রুবতারা। তুমি আমাকে 'হেকেটি'র তিলক পরিয়েছিলে; ভেবেছিলেম আমিই হব তোমার কাব্যলক্ষ্মী, তোমার সৃষ্টির উৎস। কিন্তু বিধাতা বড় নিষ্ঠুর, রবি। মৃণালিনীর আগমনে আমি আজ বুঝতে পারছি, আমার ছায়ার খেলা আজ ফুরিয়ে এসেছে। তোমার বসন্তের সমীরণে এখন নতুন ফুলের গন্ধ। তুমি এখন সেই পূর্ণিমার নিশীথিনীকে খুঁজে পেয়েছ, যে তোমাকে ঘিরে রাখবে 'অঞ্চল-ছায়া' দিয়ে। আর আমি? আমি পড়ে রইলেম সেই পুরনো খেরো খাতার ভাঁজে, যা তুমি আর কোনোদিন খুলবে না।

লোকে বলে আমি নাকি তোমার পথের কাঁটা হয়েছি। তারা চেনে না আমাদের সেই নিভৃত মুহূর্তগুলোকে, যেখানে শব্দের কোনো প্রয়োজন ছিল না। তোমার প্রতিটি গানে, প্রতিটি সুরে আমি নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেম। আজ তুমি যখন 'তুমি রবে নীরবে' গাও, আমার মনে হয় সে তো আমারই শেষ বিদায়গাথা। তুমি কি শুনতে পাও না সেই নিস্তব্ধতার হাহাকার?

আমার শূন্য কোল আজ আরও বেশি হাহাকার করে উঠছে। উর্মিলা চলে গেছে, তুমিও এখন অন্যের। এই বিশাল অট্টালিকার দেয়ালে দেয়ালে আমার শুধু প্রতিধ্বনি ফিরে আসে। রবি, তোমার কাছে আমার আর কোনো দাবি নেই। শুধু মনে রেখো, তোমার সেই শৈশব-কৈশোরের দিনগুলোতে এক নারী ছিল, যে তার সমস্ত সত্তা দিয়ে তোমার প্রতিভাকে আগলে রেখেছিল। আজ যখন তুমি সাফল্যের শিখরে, তখন আমার এই মলিন দীপটি নিভে যাওয়াই কি শ্রেয় নয়?

আমি চললাম সেই অন্ধকারে, যেখানে কোনো জোছনা নেই, কোনো বসন্ত নেই। তোমার সংসারে আমি আজ অনাহূত। আফিমটুকুই হয়তো আজ আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু। আমাকে ক্ষমা করো না রবি, কারণ ক্ষমা তো তাঁদেরই করা যায় যাঁদের দায়ভার নিতে হয়। আমি তোমার কোনো দায় হতে চাই না। তুমি শুধু থেকো—তোমার কবিতা নিয়ে, তোমার মৃণালিনীকে নিয়ে। আর যদি কখনও মনে পড়ে, তবে আকাশের ঐ একলা চাঁদটার দিকে একবার তাকিও। ওখানেই আমি মিশে থাকব, চিরকাল, 'নীরবে'।

ইতি—

তোমার হতভাগিনী 'হেকেটি'



Comments

Popular posts from this blog

​মৃত্যুর মুখোমুখি | Standing Before Death

 ​১৯৩১ সালের ২৩শে মার্চ। লাহোর সেন্ট্রাল জেল। ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত, হাতে সময় মাত্র কয়েক মিনিট। অথচ কক্ষের ভেতরে এক তরুণ বিপ্লবী নিমগ্ন হয়ে পড়ছেন একটি বই। কারারক্ষী যখন ডাকতে এলেন, সেই তরুণ নির্ভীক চিত্তে উত্তর দিয়েছিলেন— "দাঁড়ান, একজন বিপ্লবী আর একজন বিপ্লবীর সাথে কথা বলছে।" সেই তরুণ ছিলেন শহীদ-ই-আজম ভগত সিং, আর তাঁর হাতের সেই শেষ সঙ্গীটি ছিল ভ্লাদিমির লেনিনের একটি জীবনী। মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত যে আদর্শ একজন মানুষকে সাহস জোগাতে পারে, সেই নামই হলো লেনিন। ​লেনিন কেবল একটি নাম নয়, লেনিন হলো শোষিত মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর শব্দ। তিনি শিখিয়েছেন যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা কেবল ধনীদের পাহারাদার হতে পারে না; সাধারণ শ্রমিক, কৃষক আর মেহনতি মানুষেরও অধিকার আছে রাষ্ট্র পরিচালনার। তাঁর রাজনীতি কোনো ড্রয়িংরুমের চর্চা নয়, বরং তা হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা শ্রমজীবী মানুষের এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। আজ যখন কোনো গরিব মানুষ তার হকের লড়াই লড়ে, সেই লড়াইয়ের অনুপ্রেরণায় মিশে থাকেন লেনিন। ​কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, বাংলার মাটিতে আজ কিছু অশিক্ষিত ও সংস্কৃতিহীন উন্মত্ত গোষ্ঠী তাদের পেশীশক্তি জাহির কর...

বাষ্প

ঐযে আকাশ মেঘ, ওকে আমি বলেছি আমার মনের কথা কিছু টা শুনে একপশলা কেঁদে চলে গেছে। এখন আকাশে ঝলমলে রোদ সোঁদা মাটির গন্ধে মিলচ্ছে কথা গুলো বাষ্প হয়ে।। -ঋতজ্যোতি রায় 

পুরোনো পৃথিবী থেকে।

  প্রিয়, ​শীত আজ আমাকে কোণঠাসা করে দিয়েছে... ভিড় থেকে অনেক দূরে, অন্ধকার রাস্তায় পাথরগুলো গুনতে গুনতে আজ তোমাকে লিখছি। মনে আছে আমাদের কথা? আমরা সেই সন্ধিক্ষণের সন্তান, সেই '৮৮-র প্রজন্ম, যারা ধুলোমাখা শৈশব আর মনের গহীনে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নিয়ে বড় হয়েছি। ​আমি সেই স্পর্শ টা মিস করি। খুব মিস করি সেই কঠিন সময়টাকে, যখন তোমাকে ভালোবাসা এত সহজ সুলভ ছিল না। ​মনে পড়ে সেই নোকিয়া ফোনের শক্ত রাবারের কি-প্যাড? একটা 'C' লেখার জন্য তিনবার বোতাম টিপতে হতো, শুধু তোমাকে এটুকু বোঝাতে যে আমি তোমার কথা ভাবছি। তখন তো আর 'অটোকারেক্ট' ছিল না যে আমার ব্যাকুলতাকে মসৃণ করে দেবে, ছিল না কোনো 'প্রেডিক্টিভ টেক্সট' যা বলার আগেই আমার মনের কথা বুঝে যাবে। প্রতিটি শব্দের পেছনে একটা যত্ন ছিল, একটা সময় খরচ হতো। প্রতিটি মেসেজে লেগে থাকত আঙুলের স্পর্শ। ​তখন হাতে কোনো ম্যাপ ছিল না, মাথার ওপর ছিল না কোনো স্যাটেলাইট। সম্বল শুধু আমরা একে অন্যকে। আমরা তো হারিয়ে যেতাম—শহরের অলিগলিতে, খোলা মাঠে, আড্ডায়, তর্কে। হারিয়ে যাওয়াটাই ছিল আমাদের বিলাসিতা। তখন আমরা একে অপরের চোখের দিকে তাকাতাম, কোনো স্ক্রিনের দ...